আন্তর্জাতিক অভিবাসী ও জাতীয় প্রবাসী দিবস

কাজ না পেয়ে বাড়ছে দেশে ফেরা প্রবাসীর সংখ্যা

ভাগ্য ফেরানোর আশায় জমি ও গরু বিক্রি এবং ঋণ করে সাড়ে ৫ লাখ টাকায় কাতার যান জামালপুরের সুলতান মিয়ার ছেলে মো. দিপু হাসান। কিন্তু দুই মাস দুইদিন কাজ করার পরও বেতন পাননি। ভিসা নিয়ে

ভাগ্য ফেরানোর আশায় জমি ও গরু বিক্রি এবং ঋণ করে সাড়ে ৫ লাখ টাকায় কাতার যান জামালপুরের সুলতান মিয়ার ছেলে মো. দিপু হাসান। কিন্তু দুই মাস দুইদিন কাজ করার পরও বেতন পাননি। ভিসা নিয়ে যার মাধ্যমে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন সে অবস্থাও রেখে যাননি। আবার অন্য কোথাও কাজ পাচ্ছিলেন না। তাই উপায় না পেয়ে দেশেই ফিরে আসতে বাধ্য হন দিপু।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে দিপু হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কাতারে থেকে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাজ করেও টাকা পাইনি। খাবার দেয়া হতো না। দুই মাস অনেক কষ্টে থেকেছি। বাড়ি থেকে যে টাকা পাঠাবে, সে অবস্থাও তো রেখে যাইনি। গরু ও চাষের জমি সবই বিক্রি করেছি, ঋণ নিয়েছি। বিদেশে কেউ ধার দেয়ার মতোও নেই। কাজ করে বেতন না পাওয়ায় আর থাকা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে দেশে ফিরেছি। এখন সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব।’

শুধু দিপু হাসানই নন, প্রবাসফেরত হাজার হাজার কর্মীর পেছনের গল্পটাই যেন একই সূত্রে গাঁথা।

নিজের সঞ্চয় আর ঋণ করে মোট ৪ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার আমিনুর রহমান। কাজ ছিল পরিচ্ছন্নতা কর্মীর। তবে সেখানে যাওয়ার দুই মাস পর তার একটি শারীরিক সমস্যা ধরা পড়ে। অনেক টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে কোম্পানি চিকিৎসা ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয় আমিনুরকে।

জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আউট পাস নিয়ে দেশে ফেরত এসেছেন ৪০ হাজার ৩০৫ কর্মী। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়া, চিকিৎসাবঞ্চিত ও প্রতারণার শিকার হয়ে বিভিন্ন দেশে কর্মী হিসেবে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৯২৬ জন। এদিকে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের তথ্যমতে, কাজ না থাকায় দেশে ফিরতে নিবন্ধন করেছেন ৩১ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়োগকারী দেশের সরকারই আউট পাস দিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেয়। মালিক অথবা কোম্পানি টিকিট কেটে কর্মীদের পাঠিয়ে দেয়। আউট পাস নিয়ে দেশে ফেরত আসা কর্মীদের বেশির ভাগেরই ডকুমেন্টস নেই। অনেকে কাজ পাননি, কারো ভিসা-পাসপোর্ট কিছুই নেই। আবার অনেকে ক্রাইম করায় দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ পদ্ধতিতে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী দেশে ফিরেছেন জুলাইয়ে, প্রায় সাড়ে ১০ হাজার।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, গত ১৯ মাসে বিভিন্ন দেশে গিয়ে ছয় মাসের মধ্যেই দেশে ফিরেছেন এমন কর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ৯২৬। এর মধ্যে সৌদি আরব ফেরত ৭৭৬, মালয়েশিয়া ২২১, ওমান ২১৬, দুবাই ১২২, রোমানিয়া ৮৭, কাতার ১২২, আরব আমিরাত ৬৭, কুয়েত ৭৪, কিরগিজস্তান ৫২, উজবেকিস্তান ৪৩, কাজাখস্তান ২৮ ও সিঙ্গাপুর ফেরত ৮৭ জন। তারা সবাই ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে বীমা সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তবে যারা আবেদন করেননি তাদের সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি।

বীমা সুবিধার আওতায় ৫০ হাজার টাকা পেতে আবেদন করেছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের বকুল বেগম। একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে ঋণ নিয়ে দালালকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে গত বছরের ১১ নভেম্বর সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। শারীরিক নির্যাতন ও অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে দুই মাসের মধ্যে দেশে ফেরত আসেন। বকুল বেগম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলাম, কিন্তু গৃহকর্ত্রী শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। খাবারের কষ্ট দিত। অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা কোনো প্রকার চিকিৎসা না করিয়েই আমাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে আমি আমার সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে জীবন পার করছি।’

বীমা সুবিধার আওতায় ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফেরত প্রবাসীরা ৫০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। এ তথ্য জানিয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপপরিচালক (কল্যাণ) মুহাম্মদ আজিজুল ইসলাম ভূঞা বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০টি বীমার আবেদন পড়ে, যারা ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরেছেন। এসব কর্মীর মধ্যে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে ৪১২ জনকে, জীবন বীমা করপোরেশন অফিসে বীমা দাবি আদায়ের জন্য তথ্য পাঠানো হয়েছে ১ হাজার ৬২০ জনের, তথ্য প্রেরণ প্রক্রিয়ধীন রয়েছে ৩০৬ জনের। জীবন বীমা করপোরেশন অফিস থেকে বীমা দাবির অর্থ আদায় করা হয়েছে ৬৮৪ জনের।’

এদিকে অভিবাসন প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরতে ৩১ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী নিবন্ধন করেছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যম হারিয়ান মেট্রোর ১১ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতো জাকারিয়া শাবান জানিয়েছিলেন, যারা দেশে ফিরছেন তাদের বেশির ভাগই বেকার কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন। আবার সম্প্রতি ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় এসে কাজ না পেয়ে প্রতারণার শিকার হয়েও অনেকে ফিরে গেছেন।

দেশটির অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরাতে চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে প্রত্যাবাসন কর্মসূচি চালু হয়। এ কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে ৩১ হাজার ৪১ বাংলাদেশী নাম নিবন্ধন করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ দেশে এসে কাজ পাচ্ছেন না এ রকম অনেক কর্মী রয়েছেন। তবে সংখ্যাটা বেশি নয়। অনেক সময় দেখা যায়, যে কোম্পানিতে এসেছেন তারা অনেক বেশি কর্মী নিয়ে এসেছে। তখন এ সমস্যা তৈরি হয়। তবে এখন তো বাজার বন্ধ রয়েছে। যখন বাজার চালু ছিল তখন এ সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অবশ্য যারা কাজ পাচ্ছেন না, তাদের কেউ যদি আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেন তখন আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তাছাড়া কত কর্মী দেশে ফেরত গেছেন তার সঠিক কোনো ডাটা তৈরি করা হয়নি।’

অনেক প্রবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানো কিংবা নিজ থেকেই ফেরত আসার অনেকগুলো কারণ রয়েছে বলে মনে করেন জনশক্তি রফতানিসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে বড় কারণ হলো বিদেশে গিয়ে পছন্দমতো কাজ না পাওয়া। অনেক কোম্পানি আবার এক কাজের কথা বলে অন্য একটা দেয়। আবার আকামার সমস্যাও রয়েছে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। মূলত এ ইস্যুগুলোর কারণে কর্মীরা বেশি ফেরত আসছেন। এখন এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে একেক দেশের জন্য একেক নীতি গ্রহণ করা জরুরি বলে জানান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সমস্যাগুলো সমাধানের পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। এখানে দূতাবাসের বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। কেননা দূতাবাস থেকে সত্যায়নের মাধ্যমে কোম্পানিতে কর্মী পাঠানো হয়। ফলে কর্মী যখন কাজ পাচ্ছেস না তখন দূতাবাসের যাচাই-বাছাই ঠিকমতো ছিল কিনা তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।’

অনেক সময় কাজ না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়ে যান কফিলরা। আবার কাজ না থাকলেও সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে ভিসি বিক্রি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ তথ্য জানিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সিআর আবরার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার ধারণা আউট পাস নিয়ে দেশে ফেরা কর্মীদের বড় একটি অংশ হবে এটি। তাই এর জন্য দায়ী কে—আমাদের দেশের এজেন্সি, নাকি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সেই সঙ্গে দূতাবাসের ভূমিকা কী; এসব খতিয়ে দেখা উচিত। প্রয়োজন হলে আমরা যারা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত তারাও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারি। তাহলেই সঠিক পলিসি সুপারিশ করতে পারব। তাতে এ সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে। অন্যথায় লোকজন আসতে থাকবে, সাংবাদিকরা লিখতে থাকবে আর আমরা মন্তব্য দিয়ে যাব; এতে কোনো সমাধান হবে না।’

আরও